slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

বাহা (ফুল) উৎসব, প্রকৃতি এবং জীবন যেখানে একই সুত্রে গাঁথা।

কথা বললেই গান, পা বাড়ালেই নাচ! আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই গাইতে জানে, নাচতে জানে।প্রকৃতির অন্তরঙ্গ সস্পর্কে জড়িত তাদের শিল্প ও সঙ্গিত জীবন। তারা নাচে সামাজিক উৎসবে, বিয়ের অনুষ্ঠানে, অতিথি বরণে, পূজা পার্বনে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। হাতে হাত ধরে, কোরাসে, কোমর দুলিয়ে তুমদা-তামাকের ছন্দে তারা জীবনের কথা বলে, প্রকৃতির কথা বলে।

বসন্তের আগমেন প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সজ্জিত, গাছে গাছে শাল, শিমুল, মহুয়া, চম্পা, পলাশ ফুল প্রস্ফুটিত। তখন ফুলকে বরণ করে নিতে তারা আয়োজন করে উৎসবের। তাদের মেয়েরা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে এই অয়োজনের। কারণ এই উৎসব হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা খোঁপায় ফুল পরতে পারবে না, গাছের পাতা ছিড়বে পারবে না! তারা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ফুলকে বরণ করে নিয়ে তারপর নিজেকে সজ্জিত করবে!

প্রকৃতি প্রেমী, সৌন্দর্য প্রিয়, ভুমি সন্তান, উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী সাঁওতালদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাহা উৎসবের কথা বলছি। সাঁওতালি ভাষায় বাহা শব্দের বাংলা অর্থ ফুল। ফাল্গুন মাসে হয় বলে এই উৎসবের আরেক নাম ফাগুয়া।এই মাসের পূর্ণ পূর্ণিমার পর গ্রাম প্রধান বা মানঝি হারাম গ্রামের সবাইকে নিয়ে উৎসবের দিন তারিখ ঠিক করেন। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে টানা তিন চারদিন উৎসব চলে।

উৎসবের প্রথম দিন নিয়ম অনুসারে জগ মানঝি (সহকারী গ্রাম প্রধান) গ্রামের যুকদের নিয়ে জাহের থানে (পূজার নির্ধারিত স্থান) তাদের তিন দেবতা জাহের এঁরা, মারংবুরু এবং পারগানা বোঙ্গার জন্য ছোট ছোট তিনটি ঘর তৈরী করে বাড়ী ফিরে আসবেন। এরপর নাইকে (যিনি পূজা পরিচালনা করেন) জাহের থানে (পূজার স্থান) পূজা দিয়ে শিকারের অস্ত্রপাতি পরিস্কার করে সাজিয়ে রাখবেন। সাজিয়ে রাখা অস্ত্রপাতি ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে জগ মানঝির নেতৃত্বে গ্রামের পুরুষরা শিকারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। শিকারীর দলটি পথে কোন চৌরাস্তার মোড়ে বনের হিংস্র জন্তু জানোয়ার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তীর ধনুক সামনে রেখে বন দেবতা বা বোঙ্গাকে স্মরণ করে শিকারে কাজ শুরু করবেন। সারাদিনের শিকার শেষে শিকারী দলটি মানঝি ও পারনিক এর বাড়ী থেকে চাল নিয়ে শিকারকৃত পশুর মাংস দিয়ে খিচুড়ী রান্না করে খাবেন। খাওয়া শেষে নাইকের বাড়ীতে সমেবেত হবেন। এরপর নাইকে নির্দেশে তুমদা, তামাকের তালে পুরুষরা সমবেত কষ্ঠে বাহা বোঙ্গা বা ফূল দেবতার নামে গান গাইবেন।

তোকয় কোকো চিয়ে লেদা বীর দিসমা দঃ

তোকয় কোকো টাণ্ডি লেদা বীর দিসাম দঃ

মোড়ে কোকো চিয়ে লেদা বীর দিসাম দঃ

তরুই কোকো কুটাম লেদা নাতো মা মযূর দঃ

অর্থাৎ- কে কে ঐ জঙ্গলে গিয়েছিল

কে কে ঐ জঙ্গলটা পরিস্কার করেছিল

ঐ জংগলে গিয়েছিল পাঁচজন লোক

ঐ জংগল পরিস্কার করেছিল ছয়জন লোক।

এই সময় উৎবের রীতি অনুসারে নির্বাচিত তিনজন সাঁওতাল যুবক বা বাহা বোঙ্গা (ফুলের দেবতা)নাইকের নিকট উপহার দাবী করবেন। প্রথম জন জাহের এঁরা বা ফুলের দেবতা (মহিলা) সে সাকাম (বালা) দাবী করবেন, দ্বিতীয় জন মারাংবুরু বা পাহোড়ের দেবতা তিনি তীর ধনুক দাবী করবেন এবং তৃতীয় জন পারগানা বোঙ্গা বা এলাকার দেবতা তাই তিনি একটি ঝুড়ি ও ঝাটা দাবী করবেন। নাইকে তাদের দাবী অনুসারে তাদেরকে এই গুলো প্রদান করবেন।তারা এগুলো নিয়ে ফুল উৎসবের মন্ডব বা জাহের থানে যাবে।এখনে তারা বাহা এঁনেচ্ বা ফুলের নাচ আর বাহা সিরিং বা ফুলের গান গাইবেন।

তাইকো রেনাঃ সাপো সাকম হালে নুই রেইমত লেওং

তাইকো রেনাঃ বাকরে মুনদম হালে নুই গেগের তেরেং

যাহের এঁরা বাকরে মনদম হালে নুই রেইমত লেন্ডং

গোসাই এঁরা বাকরে মনদম হালে নুই গেগের তেরেং।

অর্থৎ-

কার জন্য এই বালা তৈরী হলো?

কার জন্য এই হাতের আংটি তৈরী হলো?

ফুলের দেবীর জন্য হাতের বালা তৈরী হলো

সেই দেবীর জন্য হাতের বালা তৈরী হলো।

এভাবেই নাইকের বাড়ীতে সারারাত নাচগান চলবে, যাকে বলা হয় নাইকে জাগরণ।

দ্বিতীয় দিন সকালে মানঝি, জগ-মানঝি এবং পাড়ার যুবক-যুবতীসহ গ্রামের সবাই দল বেঁধে, সিঙ্গা বাজিয়ে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে নাচতে নাচতে নাইকের বাড়ীতে যাবেন। তাদের সঙ্গে থাকবে আগের দিনেই সেই তিন যুবক বাহা বোঙ্গা বা ফুলের দেবতা। তিন দেবতাদের থেকে যুবক জাহের এঁরা বা ফুলের দেবী চাইবেন হাতের বালা এবং নতুন কুলা, দ্বিতীয় যুবক মারুংবুরু বা পাহাড়ের দেবতা চাইবেন কাপি (গাছের ডাল কাটা যায় এবম ছোট কুড়ালের মত অস্ত্র), আর পারগানা বোঙ্গা নতুন একটা ডালি। নাইকে তাদের দাবী পুরণ করলে তিন দেবতা গ্রামের যুবকদের নিয়ে শাল বনের দিকে যাত্রা করবেন, শালফুল সংগ্রহের জন্য। শাল বনে গিয়ে মারাংবুরু যে গাছে সবচেয়ে বেশি ফুল দেখবেন সেই গাছে উঠে কাপি দিয়ে ডাল কেটে নিচে ফেলবেন, জাহের এঁরা ডাল থেকে ফুল ছিড়ে তার কুলায় রাখবেন, আর পারগানা বোঙ্গা ডালি সাজাবেন। ডালি সাজানো শেষ হলে সবাই মিলে নাকড়া, সিঙ্গা বাজাতে বাজাতে আবার নাইকের বাড়ীতে ফিরে আসবেন।

এদিকে তিন দেবতার ফুল নিয়ে আগমন উপলক্ষে নাইকের বাড়ীতে গ্রামের সকল মানুষের জড়ো হয়েছে, যুবক-যুবতীরা দল বেঁধে নাচ-গান করছে। নাইকে মূল উৎসবের জন্য একটা নতুন মাটির কলসী এবং জাহের এঁরার কুলায় (যে কুলায় ফুল নিয়ে এসেছে) সিঁদুর, মধু, কলা, চিনি, বাতাসা, মুড়কি সাজিয়ে উৎসব স্থলে যাবার প্রস্তুতি হচ্ছেন। প্রস্তুতি শেষ হলে নাচ গান চলা অবস্থায় তিনি সবাইকে জাহের থান বা ফুল উৎসবের স্থানে যাবার জন্য আহবান করেন।

এবার নাইকে এবং তিন দেবতার সাথে যুক্ত হয় আরও একজন অবিবাহিত একজন যুবক। নাইকে জাহের থানের তিন কোনায় সাদা সুতা দিয়ে পেচানো তিনটি তীর পুতে ফুল দেবতার উদ্দেশ্যে পূজো করেন। পূজা শেষ হলে অবিবাহিত দুইজন সাঁওতাল যুবতী নাইকের কাছে যায়। নাইকে তাদের নতুন কলসীর পানি ছিটিয়ে তাদের আঁচলে ফুল তুলে দেন। যুবতিরা যোহার বলে নাইকেকে সস্মান জানায়। নাইকে হাত তুলে তাদের আর্শিবাদ করে। যুবতিরা এবার আঁচলের ফুল খোপায় গুজে সববেত নাচে অংশ নেয়। এরপর দুইজন অবিবাহিত যুবক নাইকের কাছে যায়। নাইকে একই কায়দায় পানি ছিটিয়ে ফুল দিয়ে তদের আর্শিবাদ করে। যুবকারা ফুল মাথার পাগড়ীতে গুজে সমবেত নাচে অংশ নেয়। এরপর গ্রামের সবাই জোড়ায় জোড়ায় নাইকের থেকে ফুল আর আর্শিবাদ নিয়ে গেয়ে চলে-

কয় কিদায়েন নাজিন, কয় কেদা

মড়েঁ গোটেঞ নাজিন, সার জম বাহা

কয় কিদায়েন নাজিন, কয় কেদা

তরুই গোটেঞ নাজিন সারজম বাহা।

অর্থাৎ-

মেয়ে- বোন, আমি ফুল চাইতে গেলাম

বোন, আমি পাঁচটা শালফুল পেলাম

ছেলে-বোন আমি ফুল চাইতে গেলাম

বোন, আমি ছয়টা শালফুল পেলাম।   

গান আর নাচের মধ্যেই তিন দেবতাকে বিদায় জানানো হয়, গ্রামের সবাই নাচতে নাচতে নাইকের বাড়ী আসে। নাইকের বউ গ্রামবাসীকে একবাটি করে হাড়িয়া দিয়ে আপ্যায়ন করে। সবাই যারযার মত বাড়ী ফিরে যায়।

এবার নাইকে আর সেই তিন দেবতা, কাঁধে তীর-ধনুক, হাতে ফুলের ডালা নিয়ে সবার বাড়ীত বাড়ীতে যায়।সাথে থাকে সেই অবিবাহিত যুবক।যার কাঁধে পানি ভর্তি নতুন কলসী। বাড়ীর যুবতী মেয়েরা তাদের পা ধুয়ায়ে সরিসার তেল মাখিয়ে দেয়। অবিবাহিত যুবকটি তার কাঁধের কলসী থেকে একটু পানি ময়েদের গাঁয়ে ঢেলে দেন। নাইকে তাদের মধ্যে ফুল বিতরণ করেন। এভাবেই বাড়ী বাড়ী ঘুরে নাইকে ফুল বিতরণ করবেন আর যুবকটি তাদের গাঁয়ে পানি ঢেলে দেন।উৎসব চলে আরও দুইদিন।

সাঁওতাল যুবকের নতুন কলসীর পানিতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায় অতীতের সকল দু:খ-বেদনা, অশুভ আর অমঙ্গল ভাবনা! ফুলে ফুলে রঙ্গিন হয়ে উঠে সাঁওতাল যুবতীর খোঁপা! তুমদা, তামাকের ছন্দে হাতে হাত, কাঁধে-কাঁধ, পায়ে-পা মিলিয়ে নতুন আশায় জেগে উঠে সাঁওতাল গ্রাম………….

12345
Total votes: 39

মন্তব্য