slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

সুন্দর মনের মানুষ মাত্রই সুন্দরবনের পক্ষে

সুন্দরী মানে রূপবতী মেয়ে; এক সময় এরকমই বুঝতাম। পরে জানলাম, আমাদের ‘সুন্দরী’দের ছাড়াও সুন্দরীর অস্তিত্ব¡ আছে! সেই সুন্দরী সুন্দরবনের একটি বৃক্ষ। আর ওই ‘সুন্দরী’ থেকেই সুন্দরবন-এর নামকরণ। যদিও সাধারণ ধারণায় মনে হয়, বনটি সুন্দর বা এর সৌন্দর্যের কারণেই এর নাম ‘সুন্দরবন’। অবশ্য সুন্দরবন দেখলে বা এর নানামুখি বিশালতা-গুরুত্ব-মাহাত্ম্য জানলে এই সাধারণ ধারণাকে অস্বীকার করা যায় না। বরং যথার্থ যথোপযুক্ত মনে হয়।

সুন্দরবন সংলগ্ন রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগের পর থেকেই আমরা সুন্দরবন সম্পর্কে জানতে শুরু করেছি। এই প্রকল্পের পক্ষে এবং বিপক্ষে যারা, তারা সবাই গল্পছলেও সুন্দরবন সম্পর্কিত অনেক তথ্য-উপাত্ত আমাদেরকে জানিয়েছেন। আমরা জানতে পেরেছি, সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়ের অন্যতম। পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার ব-দ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলা জুড়ে বিস্তৃত। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখ- বনভূমি। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে।

সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো’র বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর বাংলাদেশ ও ভারতীয় অংশ বস্তুত একই নিরবচ্ছিন্ন ভূমিখ-ের সন্নিহিত অংশ হলেও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে সূচিবদ্ধ হয়েছে; যথাক্রমে ‘সুন্দরবন’ ও ‘সুন্দরবন জাতীয় উদ্যান’ নামে। সুন্দরবনকে জালের মতো জড়িয়ে রয়েছে সামুদ্রিক ¯্রােতধারা, কাদা, চর এবং ম্যানগ্রোভ বনভূমির লবণাক্ততাসহ ক্ষুদ্রায়তন দ্বীপমালা। মোট বনভূমির ৩১.১ শতাংশ, অর্থাৎ ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। বনভূমিটি, স্বনামে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরনের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। জরিপ মোতাবেক ৫০০ বাঘ ও ৩০,০০০ চিত্রা হরিণ রয়েছে এখন সুন্দরবন এলাকায়। ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবন রামসার স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এছাড়াও বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে সুন্দরবনের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভৌগোলিক গঠন, জলবায়ু পরিবর্তনের সুন্দরবনের প্রভাব, অর্থনৈতিক ভূমিকা, উদ্ভিদবৈচিত্র, প্রাণীবৈচিত্র, মৎস্য সম্পদ ও অভয়ারণ্যসহ নানান প্রসঙ্গ।

সব মিলিয়ে, স্বাভাবিক কারণেই এই মহাপ্রাণ সুন্দরবন রক্ষায় সুন্দরমনের মানুষেরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। সুন্দরভাবেই চলছে। আপাতত অহিংস ও সৃজনশীল উপায়ে। সচেতন মানুষমাত্রই তাদের যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। রাজপথের পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতেও বিরামহীনভাবে চলছে সৃজনশীল প্রতিবাদ। প্রতিদিনই সুন্দরবনের পক্ষে উচ্চারিত হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ-কথা গান-কবিতা; আঁকা হচ্ছে ছবি ও কার্টুন। এর মধ্যে বেশ কয়েকদিন ধরে ফেসবুক জুড়ে একটি পোস্ট ভাইরাল হয়ে পড়েছে। সেখানে সবাই যার যার নাম উল্লেখ করে বলছে, ‘আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের একজন নাগরিক। এবং সংবিধানের ৭-এর (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশের মালিক। আমি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বিদ্যুৎ আমিও চাই কিন্তু সুন্দরবন ধ্বংস করে আমার বিদ্যুৎ-এর দরকার নেই। অনুগ্রহ করে আপনিও আপনার প্রতিবাদ জানান; কারণ এই দেশটি আপনারও, এই সুন্দরবনের মালিক আপনিও। লেখাটা কপি, পেস্ট করে আপনারা প্রত্যেকের টাইমলাইনে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলুন। প্রাণপ্রিয় সুন্দরবন ও বাংলাদেশকে রক্ষা করুন। ‘সেভ সুন্দরবন, সে নো টু রামপাল’।</div> <div> সুন্দরবন রক্ষার প্রশ্নে আমি ব্যক্তিগতভাবে শুরু থেকেই সক্রিয়। ফেসবুক প্রতিবাদেও শুরু থেকেই সামিল এবং সক্রিয়। আমার ফেসবুক বন্ধুদের প্রায় ৯৯% জনই সুন্দরবন রক্ষার ইস্যুতে সাড়া দিয়েছে। তারা প্রায় সবাই এই প্রথম কোনো একটি জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের শক্তপোক্ত অভিন্ন সুস্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছেন। তারা যথেষ্ট ন¤্র-ভদ্র-সাংবিধানিক ভাষায় চমৎকার ‘ডিজিটাল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়’ সুন্দরবনের পক্ষে তাদের যার যার ভোট দিয়েছেন। হ্যাঁ, বলা চলে, এটা ছিল ‘ঘোষিত-ডিজিটাল সরকারের’ আমলে সংঘটিত একমাত্র অঘোষিত সর্বাধুনিক স্বচ্ছ ডিজিটাল নির্বাচন! যাতে আমার ফেসবুক বন্ধুরা ‘সত্যিকারের স্বতঃস্ফূর্ততায়’ সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ এবং সচেতন-সুন্দরভাবে সুন্দরবনকে ভোট দিল। সুন্দরবন এখন বিপুল ভোটে জয়যুক্ত! কেননা সুন্দরমনের মানুষমাত্রই যে কোনো মূল্যে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে চায়। আর এই ঘটনা বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং গণমানুষের জন্যও নিঃসন্দেহে আশা আনন্দ জাগানিয়া সুখবর।

আরও একটা সুখবর এবং বিরাট ভরসার জায়গা হলো স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সঙ্গে আছেন! বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ উদ্বোধনকালে বলেছিলেন, আমরা গাছ লাগাইয়া সুন্দরবন পয়দা করি নাই। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রকৃতি এটাকে করে দিয়েছে বাংলাদেশকে রক্ষা করার জন্য। বঙ্গোপসাগরের পাশে দিয়ে যে সুন্দরবনটা রয়েছে এইটা হলো ব্যারিয়ার। এটা যদি রক্ষা করা না হয় তাহলে একদিন খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, কুমিল্লার কিছু অংশ, ঢাকার কিছু অংশ এ পর্যন্ত সমস্ত এরিয়া সমুদ্রের মধ্যে চলে যাবে এবং এগুলো হাতিয়া, সন্দ্বীপের মতো আইল্যান্ড হয়ে যাবে। একবার যদি সুন্দরবন শেষ হয়ে যায়Ñ তো সমুদ্র যে ভাঙন সৃষ্টি করবে সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করার কোনো উপায় আর নাই।’

 আমি এবং আমার বন্ধুরা এখন প্রাণে-মনে আশা করব, ‘সরকার’ নামের যে ‘বোধ-বুদ্ধি-যুক্তিহীন সত্ত্বা’টি এতদিন ধরে ওই বহুমুখি আত্মঘাতী প্রকল্পটিকে ¯্রফে গায়ের জোরে এগিয়ে নিতে চাচ্ছিল, তারা শিগগিরই দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তা থেকে সসম্মানে সরে আসবে এবং ওই চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেবে। না হয় শিগগিরই, আপাত অহিংস এই সুন্দর-সৃজনশীল প্রতিবাদের ভাষা অন্য ভিন্নরূপ পাবে; আন্দোলন চলে যাবে ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ প্রক্রিয়ায়! সুকান্তকে স্মরণ করছি, সেই কিশোর কবি একদিন উচ্চারণ করেছিলেন এক অবাক মানচিত্র : হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ/ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে/ সে কোলাহলের রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ/জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে!  জয় সুন্দরমন! জয় সুন্দরবন! জয় বাংলা। 

12345
Total votes: 82

মন্তব্য