slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

অন্ধ নিরাঙ্গম

লক্ষ্মীরে কেন খুন করেছিলাম, তার কিছুই মনে পড়ছে না। খুন যে করেছিলাম তার বিষয়ে আমি শতভাগ নিশ্চিত, কিন্তু কেন খুন করেছিলাম? না, কিছুতেই তা মনে পড়ছে না। অবশ্য লক্ষ্মীরে না দেখলে এই খুন সম্পর্কে আমি কিছুই জানতে পারতাম না, ওরে প্রথম দেখতেই আমার সামনে পুরো নিউমার্কেটটা ধূসর এক মাঠ হয়ে গিয়েছিলো। শুধু এই খুন আর ধূসর মাঠ বিষয়ে আমি কিছুদিন ভাববার পর শ্যামা বৌদির কণ্ঠ শুনতে পেলাম। কিন্তু এই শ্যামা বৌদিটাই বা কে? নামের সঙ্গে চেহারাটা কল্পনা করতে গিয়ে গায়ের রঙ শ্যামলা বলে অবয়ব ভাববার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেওয়ার পর একদিন স্বপ্নে দেখলাম কালো এক নারীকে। বিশাল এক পাহাড়ের উপর থেকে ধীরে ধীরে নেমে এসে আমার হাতে একগুচ্ছ স্বর্ণচাঁপা দিয়ে বলল, ‘লক্ষ্মীরে না দিয়ো’। তারপর চোখের সামনে সে ঝরণা হয়ে গেল। স্বপ্ন কোনো সমাধান আনল না বরং আমি দিনরাত ঝরণার শব্দ শুনতে লাগলাম। প্রথমে ভীষণ অস্বস্তি লাগলেও একদিন হঠাৎ করেই মনে হলো ঝরণাটা কথা বলছে। আরও নিবিড় করে সেই শব্দে কান পাততেই শুনতে পেলাম শ্যামা বৌদির কণ্ঠস্বর। সেই একই কথা লক্ষ্মীরে না, দিয়ো, লক্ষ্মীরে না দিয়ো। লক্ষ্মীরে কি দেব না, সেই স্বর্ণচাঁপা। বুকের ভেতর থেকে শীতল এক অনূভূতি আমার সমস্তটা নিমিষেই গ্রাস করে নিলো।
 
লক্ষ্মীরে তো আমি সোহরাওয়ার্দীর উদ্যান থেকে ওই বৃষ্টির দিনে নিজের হাতে গাছ থেকে পেড়ে স্বর্ণচাঁপা দিয়েছি। স্বর্ণচাঁপা দেওয়ার সেই দিনটা ধীরে ধীরে চোখের সামনে ভেসে উঠল। সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে শহরটা ভিজছিলো, সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস না থাকলেও লক্ষ্মী আসবে বলে খুব সকালেই উঠেছিলাম। তারপরও বাসা থেকে বের হওয়ার সময় সেই তাড়াহুড়োই করতে হলো, সকালে সময় যে এত দ্রুত চলে যে বাসা থেকে বের হতেই হাঁপিয়ে উঠলাম। ছাতা না থাকায় টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গলির মাথায় দাঁড়িয়ে আছি, রিকশার কোনো দেখা নেই। হুড তোলা রিকশায় সবুজ পলিথিনে নিজেকে মুড়ে যাত্রীরা সব চোখের সামনে চলে যাচ্ছে, সঙ্গে সময়ও। ঘড়ির কাঁটায় দশমিনিট পার হয়ে গেল, লক্ষ্মী এতক্ষণ কলাবাগান পার হয়ে গেছে। ঠিক তখনই একটা রিকশা এসে থামল যাত্রীসহ, সেও নীলখেত যাচ্ছে, কারও জন্য এখানে দাঁড়াইছে। একটা ফোন করার পর রিকশাওয়ালারে ওই যাত্রী বলল, চলেন মামা। ঠিক তখনই আমি তারে বললাম, আমিও নীলখেত যাব, আমারে নিয়ে চলেন। ওই যাত্রীকে আমি তখন ঠিক খেয়াল করি নাই তাড়াহুড়োয়, কিন্তু এখনও খুব ভালো করে মনে আছে তার প্রত্যেকটা কথা। খুব বেশি কথা হয় নাই রিকশায় তাই হয়ত, কিন্তু সুবল দা নামে যখন একজন লক্ষ্মীরে খুন করার বিষয় নিয়ে আমার ভেতরে ফিসফিস করে বলল, ‘আমি তোর সুবল দা’, ঠিক তখনই আমার সেই বৃষ্টির সকালের রিকশার লোকটার কণ্ঠ যেন শুনতে পেলাম। ওই লোকটাও তো ঠিক এমন করেই বলেছিলো, নীলখেত, আসেন আসেন। এই বৃষ্টির দিনে রিকশাওয়ালারা তো মন্ত্রী হয়ে যায়, বুঝলেন। সুবল দাও আমারে এমন করেই বলেন, ‘বৃষ্টির রাত, বৃষ্টির রাত হলে ভালো হয়, খুন করে ফেললে রক্ত ধোওয়ার জন্য আলাদা জল ঢালা লাগবে না। বুঝলি।’ সুবল দা কি ওইদিন বৃষ্টির সকালে যাত্রী হয়ে এসেছিলেন রিকশায়। কিন্তু সুবল দা কে, তার কিছুই তো আমি মনে করতে পারছি নে। কিন্তু একদিন শ্যামা বৌদির কথায় জানলাম সুবল তার জামাই। কার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলাম, সুবল দা না শ্যামা বৌদি। আমি কার দিকে ছিলাম সুবল দার না শ্যামার? এরা কারা আমার? লক্ষ্মীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সবকিছু কেন এইরকম ভাবে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে! আমি কি মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি? নিজের কাছে অসংখ্যবার এই প্রশ্ন শেষে কয়েকবার ভাবছি ডাক্তারের কাছে যাই। কিন্তু ডাক্তারের কাছে গিয়ে কী বলব? লক্ষ্মীরে আমি খুন করেছি! কিন্তু লক্ষ্মী তো এই যে আমার বর্তমানেই বেঁচে আছে। বৃষ্টির সকালে তার সঙ্গে টিএসসিতে বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজছি। সোহরাওয়ার্দীতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অনেকবার ভাবছি লক্ষ্মীরে সব খুলে বলি, কিন্তু শ্যামা বৌদি প্রত্যেকবারই ভীষণ করে নিষেধ করেছেন। মনের ভেতর থেকে আমি নিজেই তেমন একটা সাড়া পাইনি। কিন্তু সবকিছু খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। লক্ষ্মী আমার জীবনে যেমন দ্রুত এসেছিলো, ঠিক তেমনই সে চলে গেল। মাত্র একসপ্তাহে সব শেষ হয়ে গেল। তারপর থেকে আর ওর সঙ্গে একদিনও দেখা হয়নি। ওই যে দেখা হওয়ার প্রথম দিনই যা ভেবেছিলাম তাই সত্যি হয়ে যাওয়ায় প্রথমে ভীষণ খারাপ লাগলেও, কে জানে সারাক্ষণ বলে গেল এমনি হওয়ার কথা ছিলো। এমনই হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কেন আমি এরকম ভাবছিলাম যে, লক্ষ্মী খুব দ্রুত চলে যাবে! তার কিছুই মনে পড়ে না। মুখোমুখি দেখা হওয়ার পর সবকিছু বদলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নয়, অন্যকিছু দেখে। সেই অন্যকিছুটা কী ছিলো, তেঁতুল গাছটা? সব ধূসর হয়ে গেলেও সে বৃষ্টিতে ঠিকই ভিজছিলো, তখন কি ওই গাছের নিচে অন্য কেউ ছিলো? হ্যাঁ, কেউ একজন ওই ধূসর গাছের নিচেই দাঁড়িয়ে ছিলো লক্ষ্মীর পাশাপাশি! কিন্তু আমি তো শুধু লক্ষ্মীরেই দেখছিলাম।
 
লক্ষ্মীর পাশে কে ছিলো তখন? প্রথম দেখাতেই প্রেমের অনুভূতি কেমন হয় জানিনে, কিন্তু প্রথম দেখাতেই খুনের অনুভূতি আমার পুরো শরীর অবশ করে দিয়েছিলো। এত চেনা ছিলো লক্ষ্মীর মুখ, যে মনে হচ্ছিল মুখের প্রত্যেকটি শিরাকে আমি যেন চিনি, আর শিরাগুলো সব নীল হয়ে  আমার হাত বেয়ে উঠে যাচ্ছে। ওইদিন লক্ষ্মী চলে যাবার পর দেখলাম আমার ডান হাতের প্রত্যেকটা শিরা দেখা যাচ্ছে, তারা সব কালচে নীল হয়ে আছে। কিন্তু কেন আমি লক্ষ্মীরে খুন করব, আর লক্ষ্মীরে মুখোমুখি দেখবার পর এইরকমই বা মনে হওয়ার কারণ কী? ওইদিন সারারাত ভীষণ অস্থিরতা নিয়ে কাটানোর পর পরদিনও লক্ষ্মীর সঙ্গে সারাদিন ঘুরে বেড়ালাম শহরজুড়ে। কিন্তু আমার ভেতরে কে যেন গলে যাচ্ছে, এমন একটা অনূভূতি কিছুতেই থামছে না। লক্ষ্মী কেন আমার দিকে বারবার অমন করে তাকাচ্ছিল, নিশ্চয়ই আমারে অস্বাভাবিক লাগছিলো। কিন্তু কথোপোকথন তো আমাদের স্বাভাবিকই হচ্ছিল! প্রেমের কথা, জীবনের কথা, শহরের প্রত্যেকদিনের চেয়ে আলাদা ছিলো দিনগুলো। কিন্তু কত বেশি আলাদা তা লক্ষ্মীর হুট করে প্রস্থানের পর টের পেলাম। 
 
আচ্ছা, ও কী জেনে গেছে আমি ওকে খুন করেছি। না, হলে এইরকম অদৃশ্য কেন সে হয়ে যাবে। কিন্তু কবে খুন করেছিলাম ওকে। কোথায়, কোন জীবনে আমি একটা খুনি ছিলাম? লক্ষ্মীর মত সত্যি সত্যি একটা দেবীরে খুন করতে হৃদয় যতখানি পাষন্ড হতে হয়, কোনোকালে আমি কী সত্যিই এমন বর্বর ছিলাম। আমি কী সত্যিই একদিন খুনি ছিলাম? একদিন কেনো, আমি কি এখনও খুনি নই, খুনের মধ্য দিয়ে যে খুনির জন্ম সে তো এখনও আমিই হয়ে বেঁচে আছি। সত্যিই কী এমন হয় নাকি। লক্ষ্মীরে দেখবার আগে অন্যকেউ আমারে এইসব কথা বললে পাগলের বেশি তারে বেশিকিছু ভাবতে পারতাম না, নিজেকেও পাগল পাগল লাগছে। লক্ষ্মীরে দেখে আমি পাগল হয়ে গেলাম, হাস্যকর যুক্তিটা যতবার ভাবি ততবার এর অসারতা আমার কানের কাছে অন্যস্বর বয়ে নিয়ে আসে। সেই স্বর বলে যায় অন্য জগতের কথা, অন্য জনমের কথা। আরেক জনম বা মরণ না বহমান শরীরের মধ্যেই অন্য এক স্বর। জন্ম মৃত্যুর ধরা-বাঁধা গণ্ডীর বাইরে আমারে টেনে যায় সেই স্বর। কিন্তু কোথায় কেন নিয়ে যাচ্ছে কিছুই মেলাতে পারছি নে। তার সঙ্গে এই খুনের সম্পর্কই বা কী? উত্তর কিছুতেই মিলাতে পারছি না। লক্ষ্মীর না থাকা হঠাৎ করে আসা বা চলে যাওয়া আমার সবকিছু ভীষণ এলোমেলো করেছে সত্য, কিন্তু তার মধ্যেও মনে হচ্ছে একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে আছি এবং এর মধ্য থেকে বের হতে পারলেই একটা নতুন জীবন। সেইখানে জন্ম মৃত্যুর নিয়ম নাই, বাঁচবার উপায় সেখানে ভিন্ন। নিজেরে ভীষণ অচেনা মনে হচ্ছে নিজেরই কাছে, মনে হচ্ছে আমার বর্তমানের এই পরিচয় মিথ্যে, এই বাঁচা অন্যকিছুর জন্য, অন্যকিছুর তরে। মনে হচ্ছে ঘুম থেকে জেগেছি, পথ চলতে ঘুমায়ে পড়বার পর হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেলে যেমন লাগে ঠিক সেইরকম একটা অনুভূতি, কতদূরে এলাম? কিন্তু কোথায় যাচ্ছি আমি, কোথা থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম তার কিছুই মেলাতে পারছি নে। ভেতর থেকে সারাক্ষণ এক অচেনা তাড়না আমারে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে খুনের হিসাবটা মেলালেই হবে, কিন্তু লক্ষ্মীরে আমি খুন করেছি সে নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকবার পরও, কেন খুন করেছি, কবে খুন করেছি, কিভাবে খুন করেছি তার কিছুই মনে পড়ছে না। এইসব উত্তর মেলাতে গিয়েই শ্যামা বৌদি আর সুবল দা’র কথা কোথা হতে যেন মনে এলো। কিন্তু তারাই বা কে? তাদের সঙ্গে কোথায় পরিচয় ছিলো আমার, কেন তারা এইসময়ে আমার মনে এলো, লক্ষ্মীর খুনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কী? শুধু প্রশ্ন আর প্রশ্ন বাড়ছে, উত্তর কিছুতেই মিলছে না। আমার ভেতরে আমি বন্দী হয়ে আছি, খুনের সাজায় যেমন কারাগারে বন্দী থাকে কয়েদি, এই শরীর কি সেই কারাগার? ছোটবেলায় একবার বিশাল এক শিমুল গাছ দেখে মনে হয়েছিলো এই গাছের নিচে আমি আগেও এসেছি। এইখানে অনেক লোকের মাঝে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একা, কেন? সেই ঘটনার কথা এখন আবার মনে পড়ছে, মনে পড়ছে হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি ফেরবার স্মৃতি। বাজারের নিত্যদিনের চেনা রাস্তায় অচেনা একজন আমার কাছে কি যেন একটা কথা জিজ্ঞেস করেছিলো, সেই কথাটা ভুলে গেছি, কিন্তু ওই লোকটারে স্পষ্ট মনে আছে। তারেও যেন কোথায় দেখেছিলাম, সেদিন রাত্রে স্বপ্নে ভীষণ খরস্রোতা এক নদীতে আমি ভেসে যাচ্ছিলাম, ওই লোকটা আমাকে টেনে তুলেছিলো নদী থেকে। অতীতের সেইসব ঘটনা এখন একে একে মনে পড়ছে। মনে পড়ছে কোথায় যেন বিয়ের বরযাত্রী গিয়েছিলাম, বোধহয় ছোটকাকার বিয়েতে, সেইখানে কখন আগে যায়নি। গিয়েও সেই অচেনা জায়গায় অচেনায় লাগছিলো। কিন্তু সকালে গ্রামের মধ্যে দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ একটা মোড়ে এসে মনে হলো এইখানে এই প্রথম আসা নয়। তখনকার সেইসব ঘটনা বহুকাল ভুলে থাকা স্মৃতির মাঝে থেকে কেন এখন উঠে আসছে। প্রত্যেকটা ঘটনার মাঝে কোথায় যেন একটা মিল আছে, কিন্তু সেই মিলটা কিছুতেই যোগ করতে পারছি নে।
 
তবে শিমুল ফুল আমি শ্যামা বৌদির চুলে দেখেছি, ওই শিমুল গাছের নিচে কী সেদিন শ্যামা বৌদিও ছিলো। ওই অচেনা লোকটা কি সুবল দা? ওই মোড়টা আগে কোথায় দেখেছিলাম, এখন কেন মনে আসছে, লক্ষ্মী কি কিছু বলেছিলো। মগজ হাঁতড়ে বেড়ায়, হাতড়ে ফিরতেই দেখি লক্ষ্মীর কথা। হ্যাঁ, সে বড় হয়ে কখনো গ্রামে যায়নি, তারপরও গ্রামের কথা মনে হলে নাকি তার মনে হয় তিনদিক থেকে তিনটে রাস্তা এসে কোথায় মিলে গেছে। সেই রাস্তার আর শেষ নাই, তারপরও ওই রাস্তায় তার খুব হাঁটার ইচ্ছে। কিন্তু একলা ওই পথে চলতে তার ইচ্ছে করে না, ভয় লাগে। শুনে আমি বলেছিলাম, ভয় কী, আমি তো আছি। তোমার হাত ধরে হাঁটব। তার উত্তরে লক্ষ্মীর উত্তরটা ছিলো - সেইজন্যই তো ভয়টা আরো বেশি। লক্ষ্মী নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছিলো আমি তার খুনি! যে কারণেই তার এমন আচমকা প্রস্থান। ওই তিন রাস্তায় কী হয়েছিলো, লক্ষ্মীর আর কী কী মনে হয় ওই রাস্তাটা নিয়ে। দেখা হয় না, ইচ্ছে হলে ফোন করে জিজ্ঞেস করা যায়। কিন্তু আমি যে খুনি, দ-প্রাপ্ত পাপী তার কাছে, সে আমারে রেখে গেছে কারাগারে। এই বন্দীত্ব কাটাতে ইচ্ছে করে না। নিজের কাছে নিজের সাজা সবচেয়ে বিশ্বস্ত। খুনিরে কী কখনও ক্ষমা করে খুন হওয়া মানুষ? না। তাই বোধ হয় লক্ষ্মীর এই আগমন, এইরকম প্রস্থান। কিন্তু আমার শরীরে আমিই বা কে যে এইসব ভেবে চলছি, ভেবে ভেবে নিজেরে পাগল ভাবছি। আমার শরীরে কার বাসা? কে আমারে খুনি বানাচ্ছে, জলজ্যান্ত লক্ষ্মীরে চোখের সামনে দেখবার, পর তার উত্তাপ পাওয়ার পরও কেন শীতলতা, তার নিঃশ্বাস ছুঁয়ে দেখবার পরও কেন মনে হয় একদিন এই নিঃশ্বাস আমি কেড়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু কেন? কেন, কেন, কেন? প্রচ- মাথাব্যাথা নিয়ে রাতের পর দিন পার হয়ে যাচ্ছে, উত্তর মিলছে না। লক্ষ্মী চোখের সামনে যতদিন ছিলো, যন্ত্রণার এক উপশম ছিলো, কিন্তু তার আচমকা প্রস্থানের পর শুধু ক্ষতই তৈরি হচ্ছে। খুন করার সময় লক্ষ্মীর যন্ত্রণা কী এর চেয়ে বেশি ছিলো, আমি কি ওকে তীব্র কষ্ট দিয়ে মেরেছিলাম, তিলে তিলে মৃত্যু যারে বলে! না, হলে কেন আমি তাকে না দেখতে পেয়ে এইরকম ভীষণ পিপাসায় ভুগি, গ্লাসের পর গ্লাস জল খাওয়ার পরও কেন তৃষ্ণা মেটে না। নিঃশ্বাস নিতে না পেরে মনে হয় বুকের মধ্যে তীক্ষ্ন কাঁটা এ ফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে। পায়ের নিচে মনে হয় বাঁশের ছাল দিয়ে একটার পর একটা টান দিয়ে যাচ্ছে কেউ। ওফ্, আমি কী লক্ষ্মীকে এমন ভীষণ শাস্তি দিয়ে মেরেছি, অমন সুন্দরের সঙ্গে আমি এমন নিষ্ঠুরতা করেছি। 
 
সত্যিই কি কোনোকালে সুন্দরের সঙ্গে বৈরীতা ছিলো আমার, ভীষণ নৃশংসতায় সুন্দররে করেছিলাম বীভৎস? কে আমি, নৃশংস হন্তারক? কিন্তু তাহলে কেন শুধুমাত্র লক্ষ্মীরেই খুন করব, নাকি আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হওয়া বাকি! কিন্তু এই অতিকল্পনায় হৃদয় সাড়া দেয় না, ভেতর থেকে শুধু বলে যায় লক্ষ্মী, কেন লক্ষ্মীরে আমি খুন করেছিলাম। কোন কালে, কবে লক্ষ্মীর রক্ত আমি বৃষ্টি জলে ধুয়েছিলাম। কোন অন্ধকারে সমস্ত নৃশংসতায় ধ্বংস করেছিলাম এমন সুন্দররে আমি। কে ছিলাম আমি তখন, আর এই যে এখন বেঁচে থাকা লক্ষ্মীরে দেখে এমন যন্ত্রণায় সারাক্ষণ ছটফট করছি সেই আমিই কী আমি? আমার বর্তমানের বাস্তবতায় কোন অনন্তকালের ছায়া, রোদ্দুর দেখি না, শুধু বৃষ্টি আর মেঘ। রোদ্দুর যে ছিলো সে চলে গেছে, জানি এ জীবনে লক্ষ্মীরে আর পাব না। দেখা হবে না আর আমাদের, যেটুকু মনে করাতে তার আগমণ, সেটুকু তো হয়ে গেছে। ফুরাইছে তার কাজ। কিন্তু কে আমি, কার কাছে যাবো এখন, কে আছে আমার, কোথায়? 
[আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে]
 
 
[বহুকাল পর এই ফিরে আসা যেন বাধ্যতামূলক। যেন এই উপন্যাস শেষ করতে হলে আমারে এইখানেই লিখে যেতে হবে। যেহেতু এই প্রথম সেহেতু না জানার পরিমাণই বেশি। তবুও আশা রেখে যাই পাবো পাঠকের সুপরামর্শ, পাবো সমালোচকের দেখা। নিশ্চয়ই শেষ করতে পারবো যদি পাই ভালোবাসা।]
 

 

লেখার ধরন: 
12345
Total votes: 181

মন্তব্য

এটি লক্ষ্মীর খুনি কিংবা বিসর্জনকারীর মানসিক অবস্থার খণ্ডচিত্রের প্রাথমিক উপস্থাপন মাত্র। আরও বিস্তারিত হলে পরিস্কার হবে। আশায় থাকলাম...

মন্তব্য