slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

পালাও পালাও

বছর ত্রিশেক আগের কথা। যে গ্রামে আমার শৈশব কাটে সেখানকার এমন কোন বাড়ি নেই যে বাড়ির অন্তত একজন ভাগ্যান্বেষণে ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা খুলনা যাত্রা করেনি। ওই সময়ে যার গল্প গ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফিরত এবং সবাই প্রণিধানযোগ্য বলে বিবেচনা করত সে এলাকায় খলিল সাহেব নামে পরিচিত। তার বিষয়ে গ্রামে অনেক গল্প প্রচলিত ছিল। ছেলেবেলায় সে নাকি ছিল খুব ডানপিটে, স্কুলে যেতে চাইত না। বাবা আর বড় ভাই মিলে একদিন ব্যাপক মারধর করলে কাউকে কিছু না জানিয়ে লঞ্চে চড়ে বসে। তখন পাকিস্তান আমল। ঢাকায় গিয়ে শুরু করে মুটেগিরি । আয় যাই হোক না কেন তার নির্দিষ্ট একটা অংশ প্রতিদিন জমিয়ে রাখত সে, এরপর একসময় রেডিও মেকানিক্সের কাজ শুরু করে। পরে সে লাইটিং ব্যবসায় কিভাবে আসে সেই গল্প আমার জানা নেই, তবে সেই ব্যবসায় তার সিদ্ধিলাভ হয় এবং একসময় কেউকেটা ধনী ব্যক্তি হয়ে ওঠে। তার হাত ধরে গ্রামের অনেক মানুষ ঢাকায় পাড়ি জমায়, কেউবা চাকুরি করে ভাগ্য ফেরায়, কেউবা ছোটখাট উদ্যোক্তাও হয়, কেউ আবার কিছু না করতে পেরে গ্রামেই ফিরে আসে।
 
এখানে কিছু হবে না, যে করেই হোক অন্যত্র যেতে হবে এই প্রবণতা সেসময় গ্রামে খুব একটা টের পাইনি। হয়ত ছোট ছিলাম বলে সে আঁচ আমার পর্যন্ত পৌঁছেনি। তবে যারা একবার অন্য কোথাও পাড়ি জমাবার পর দেশে ফিরে আসত তাদেরকে ভিন্ন চোখে দেখা হত, ”ফির‌্যা আইছ কেন, দ্যাশগাঁয়ে থাইক্যা কি করবা?” ইত্যকার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হত। অনেককে দেখেছি, গ্রামে কিছুদিন কাটিয়ে নতুন উদ্যমে আবার পাড়ি জমাচ্ছে আশীর্বাদহীন ফেলে আসা ভাগ্যপুরীতে।
 
যখন একটু বড় হলাম তখন থাকি এক উপজেলা সদরে। সেখানকার প্রচুর মানুষ মধ্যপ্রাচ্যে থাকে, ইরাক, লিবিয়া, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব। সবাই সচ্ছল, ঘরে ঘরে ভিসিআর-রঙিন টিভি। ডাকপিয়ন চিঠি নিয়ে এলে বিশেষ বখশিশ। এগুলো একধরনের মোহ তৈরি করত তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে বিদেশ যেতেই হবে এমন কোন পাগলামী তখন টের পাইনি, সেও সম্ভবত ছোট ছিলাম বলেই।
 
যখন আরেকটু বড় হলাম অর্থাৎ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছি, তখন আশেপাশে গুঞ্জন টের পেতে লাগলাম। ”ইন্টার পাশের পর কি করবি? এখানে কিচ্ছু হবে না, এখানে থাকা মানে আত্মহত্যা করা, কোন ভবিষ্যত নাই, যে করেই হোক ঢাকায় উঠতে হবে।” চতুর্দিকে এত বেশি ঢাকা ঢাকা রব উঠল, সেই রবে আমিও সামিল হলাম। উচ্চমাধ্যমিক শেষ হতে না হতেই আমিসহ আমার ব্যাচের সবাই ঢাকায়। দেখতে দেখতে সেখানে একটা মৌচাক গড়ে উঠল, এ যাবৎ যত স্কুলে পড়েছি এবং সেখানে যাদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা ছিল সবার সঙ্গেই আবার দেখা হতে লাগল। ঢাকায় ওঠা ভীষণভাবে স্বার্থক হল। কিছুদিন পরে আবার সেই মৌচাক ভেঙেও গেল, নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল সবাই, কেউ কেউ পাড়ি জমাল ব্যাঙ্গালোর, পুনে, মাদ্রাজ, কোডাইকানাল।
 
আমরা যারা দেশেই থেকে গেলাম তাদের মধ্যে আবার এক উন্মাদনা শুরু হল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পর্যায়ে এসে, বিদেশ পাড়ি দিতে হবে। এই দেশে কোন সম্মানজনক চাকুরি নাই, যদি অনেক সাধনার পর সম্মানজনক পদ মিলেও যায় তাতে সম্মানজনক রিমিউনারেশন নাই, সুতরাং পালাতে হবে, এই দেশে থাকা চলবে না। এখানে নিজে কিছু করাও যাবে না, একেতো পুঁজি নাই তার ওপর সবকিছুতেই ঝুঁকি, তার থেকে বিদেশ যাও, পড়াশোনার নাম করে মুটেমজুরগিরি করে পয়সা কামাও, আর পড়াশোনা শেষ করলে সম্মানজনক একটা চাকুরি ওখানে জুটেও যেতে পারে, সবচেয়ে বড় কথা লাইফের তো একটা সিকিউরিটি আছে! আমার আশেপাশে শুরু হল লন্ডনের উন্মাদনা, অস্ট্রেলিয়ার উন্মাদনা, সাইপ্রাসের উন্মাদনা। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার বছরখানেকের মধ্যে আবিষ্কার করলাম শিক্ষা জীবনের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে বেশিরভাগই দেশের বাইরে। ঢাকা, কুমিল্লা কিংবা বরিশালে আড্ডা দেয়ার মানুষ নেই, বরং লন্ডনে গেলে আমি নিশ্চিত সেই সোনালী সময় ফিরে পেতাম টেমস নদীর তীরে।
 
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই একবার সাইপ্রাসের ঢেউ উঠল। পত্রিকা, রাস্তাঘাট সাইপ্রাসের বিজ্ঞাপনে সয়লাব। স্টুডেন্ট ভিসায় দেদারসে অল্প বয়সীরা পাড়ি জমাতে থাকল সাইপ্রাস। কেউ যাচ্ছে মাস্টার্স করতে, কেউ যাচ্ছে ব্যাচেলর করতে। সেই স্রোতের চূড়ান্ত পর্যায়ে একদল আবার ফিরতে শুরু করল। তেমন একজন সাইপ্রাস ফেরত ছোট ভাইয়ের অভিজ্ঞতা শুনে আমরা সবাই থ বনে গেলাম। বলে কী!
 
সাইপ্রাসে তখন এত বেশি বাংলাদেশি যে, সাইপ্রটদের তুলনায় রাস্তাঘাটে বাংলাদেশি বেশি দেখা যেত। আর পড়ালেখা ওর উদ্দেশ্য ছিল না - উদ্দেশ্য ছিল ভাল রোজগার করা এবং সুযোগ পেলে গ্রিস পাড়ি দেয়া, তারপর ইতালি। ওখানকার বেশিরভাগ বাংলাদেশিরই একটা উদ্দেশ্য, যে করেই হোক ইউরোপের মূলভূমিতে পদার্পণ করতে হবে। কারণ, সাইপ্রাসে তখন কাজের থেকে কাজ করার লোক বেশি হয়ে গেছে, আয় তেমন নেই। ওরা কয়েকজন গ্রিস পাড়ি দেবার একটা রাস্তাও খুঁজে পেল। তুুরস্কের মূল ভূমিতে একটা গ্রুপের সাথে যোগাযোগ হয়। ওরা নৌকায় করে সাগর পার করে দেবে। আর নৌকার সারথী হল বাংলাদেশি, আফগান আর পাকিস্তানি। কোন এক মধ্যরাতে যখন ওরা নৌকায় উঠতে যাবে তার ঠিক আগ মুহূর্তে পুলিশ এসে পড়ে। ওরা কোন মতে পালিয়ে জঙ্গলে ঢোকে, সারারাত জঙ্গলে দৌড়ে সকালে এক সৈকতে এসে উপস্থিত হয়, ওকে ক্ষুধার্ত এবং পরিশ্রান্ত দেখে এক তরুণী দোকানির মায়া হয়, সে খেতে দেয় এবং পুরো বিষয়টি জানার পর সে আবার দালালের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দেয়। আবার দিনক্ষণ ঠিক হয়, আবার মধ্যরাতে নৌকায় চড়ে বসে। কিন্তু এবার বিধি সম্পূর্ণ বাম, ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল একদল পুলিশ। সবকটাকে বেঁধে নিয়ে গেল থানায়। যার কাছে যা ছিল, মোবাইল, ডলার, পাসপোর্ট সবকিছু কেড়ে নিল। কয়েকদিন হাজতে রেখে ওদের টাকা দিয়েই একটি বাস ভাড়া করে আনল। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যরাতে এক জায়গায় এসে বাস দাঁড়ায়, সবাইকে নামতে বলে। ওরা ভয় পেয়ে যায়। একএকজন নেমে এগিয়ে যায় আর পুলিশ রাইফেলের বাট দিয়ে পশ্চাৎদেশে বাড়ি দেয়। শুধু পাকিস্তানীদের ক্ষেত্রে একটু ব্যতিক্রম। পশ্চাৎদেশে বাড়ির পরে তাদের এক পায়ের জুতো খুলে রাখা হয়। এরপর সবাইকে পুশ করা হয় ইরানের বর্ডারে। যাক প্রাণে বাঁচা গেল বলে হাঁফ ছাড়ে ওরা।
 
সারারাত ওরা পাহাড় ধরে হাঁটে, বরফের রাস্তা, যাদের এক পায়ে জুতো নেই তারা নিশ্চিত গ্যাঙগ্রিনের কোপে পড়বে। সেই বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে যখন ভোর হল, তখন ওরা অদূরে একটি গ্রাম দেখতে পেল। সেখানে কয়েকজন খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। তিন দেশের তিনটি গ্রুপ। সিলেটি এক দালাল বাংলাদেশিদের নিল, আফগান দালাল আফগানদের, পাকিস্তানি দালাল পাকিস্তানিদের। সিলেটি দালাল ওদেরকে তেহরানে নিয়ে কয়েকদিন একটা কক্ষে রেখে দেয়। ওই দালালের কাছে একজনের সঙ্গে ওর দেখা হয়, বরফে খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে যার পায়ে পচন ধরে গেছে। সে আর দেশে ফিরবে না, কারণ, ফিরিয়ে নেবার মত কেউ নেই। এখন সে দালালের নানা কাজ কর্ম করে দেয়। এরকম কয়েকজনের সাথে দেখা হল যারা এখন দালালের কৃতদাসের মত আছে সেখানে। দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দালালকে কেউ অর্থকড়ি দেয়নি বলে তাদের ভাগ্য দালালের হাতে বন্দী। আবার এমন একজনের সাথে পরিচয় হয়েছে যে কয়েকবার চেষ্টা করেছে তুরস্ক হয়ে গ্রীস যাবার এবং বারবার ব্যর্থ হয়েছে, পুশব্যাকের সম্মুখীন হয়েছে। কিন্ত তার এখন জেদ চেপে গেছে, যতক্ষণ না যেতে পারছে ততক্ষণ সে চেষ্টা চালিয়েই যাবে। এর মধ্যে সিলেটি দালাল পাকিস্তানে দালালদের সাথে যোগাযোগ করে এবং দর কষাকষির পর ওদেরকে বিক্রি করে দেয়। একদিন পাকিস্তান বর্ডারে এসে ওদেরকে ওই দালালের হাতে সমর্পণ করে যায়।
 
ও এসে পাকিস্তানের করাচিতে আশ্রয় পায়। দালাল ওকে একটা চাকুরির ব্যবস্থাও করে দেয়। কারণ, বাড়িতে টাকা ম্যানেজ করে পাঠাতে মাসখানেক দেরি হয়। যখন টাকা পাঠানো হয়, ওরা ওকে বিমানে তুলে দেয় এবং ও নির্বিঘ্নে বাড়িতে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে কেউ পাসপোর্ট দেখতে চায়নি, ভিসার দরকার হয়নি।
 
এই রুটে প্রচুর মানুষ ইউরোপে পাড়ি জমায়, অনেকে সফল হয়, অনেকে ব্যর্থ হয়। তবে কোন মিডিয়াতে এই খবর এসেছে কি না জানা নেই। আদৌ এই রুট এখনও চালু আছে কি না তাও জানা নেই।
 
আমার ধারণা এইসব ঘটনা নিভৃতে এবং নির্বিঘ্নেই ঘটে চলে সংশ্লিষ্ট দেশের প্রশাসন, প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে। সাগরে কয়েকবার ট্রলারডুবির পরেও কারও কান খাড়া হয়নি। যখন থাই সরকার একটু নড়েচড়ে বসল, জঙ্গলে অভিযানে নামল, গণকবর খুঁড়ে বের করল তখন সবার কান খাড়া হল, পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া একটা বেধড়ক ঝাঁকি খেল। এখন সেই ঝাঁকির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় অস্থির বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া।
 
এই দুই রুটের এক মিছিলে আছে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি আর অাফগানরা। আরেক মিছিলে আছে বাংলাদেশি আর মায়ানমারের রোহিঙ্গারা। কোন মিছিলে কোন ভারতীয় নেই, মায়ানমারের অন্য অঞ্চলের মানুষ নেই। ভারতের অনেক রাজ্য রয়েছে যেখানকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক পশ্চাদপদ। তাদেরকে তো কোন রুটে দেখা যায় না! মায়ানমারের শান রাজ্যে রাষ্ট্রের যে নিগ্রহ রয়েছে তা রোহিঙ্গাদের তুলনায় খুব যে কম তা বলা যাবে না, রাষ্ট্র সেখানে বিমান হামলা পর্যন্ত চালাচ্ছে, তাদেরকে তো সাগরের মিছিলে দেখা যায় না!
 
বাংলাদেশিদের এই উপায়ে পালানোর হয়ত অনেক কারণ রয়েছে। সরকার, রাষ্ট্র, প্রশাসন ইত্যাদি ইত্যাদি যত যন্ত্র আছে তাদের কাছে সবচেয়ে সস্তা হল এদেশের নাগরিক, পকেটে কয়েকটা টাকা পেলে তারা সবকিছু করতে প্রস্তুত। আবার বৈধ এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশ পাড়ি দেয়া মানেই যে বৈধ হওয়া নয় তা সবাই জানে। সাইনবোর্ডওয়ালাও প্রতারণা করে আর সাইনবোর্ড যার নেই সেও প্রতারণা করে। সুতরাং মানুষ যেকোন একটা পদ্ধতি বেছে নেয়। পাশের বাড়ির একজন যখন মিষ্টি করে অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে অনেক বড় স্বপ্ন দেখায়, অমুক গেছে তমুক গেছে বলে উদাহরণ টানে তখন বাঙ্গালি অবিশ্বাস করে কী করে! তখনই তো তার আজন্ম লালিত পলায়নের স্বপ্নের সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার মোক্ষম সময়!

 

12345
Total votes: 419

মন্তব্য

শশাঙ্ক বরণ রায়-র ছবি

তবু আমি কোথাও যাবো না

এই নোংরা শহরের নিদয় ইটের কাছে জীবনের শিক্ষা নিতে নিতে

আমি আমার কৈশোরের বিল থেকে তুলে আনা লকলকে কলমী ডগার ঝোলের

না-ভোলা তৃপ্তি নিয়ে রয়ে যাব

তবু আমি কোথাও যাবো না

........................................................

আদিবাসী বাঙ্গালী যত প্রান্তজন
এসো মিলি, গড়ে তুলি সেতুবন্ধন

খালিদ-র ছবি

মাঝেমধ্যেই মনে হয় পালানোটা খুব জরুরী। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পালিয়ে বেড়ানোর মধ্যেই বোধহয় লুকিয়ে আছে জীবনের আসল মানে! কিন্তু ঈশ্বরের মত একটা মন বলে ওঠে, শান্ত হও বৎস! এখানে যেই আমি ওখানেও তো সেই আমিই...। আর অন্য কেউ? সেও এখানে যারা, সবখানে তো তারাই...!

রেফারিগিরি জানি না বলে, ব্যাপারটা নিষ্পত্তিও হয় না। তাই অনিষ্পণ্ন অবস্থাতে আমি এখানেই আছি, ভাল-মন্দ সবই আছি!

অবৈধ পথে অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনগোষ্ঠির। আপনার লেখার এই সত্যটি গবেষণার দাবি রাখে।

মন্তব্য