গল্পটা খুব পুরনো বটে, তবে আমাদের অতি পরিচিত। গল্পটা রান্ডেলের। রান্ডেল আমাদের মতোই রক্ত-মাংসের মানুষ। বসবাস পশ্চিম বিশ্বে হলেও সে আমাদের অপরিচিত কেউ নয়; আমাদের দেশের পথেঘাটেও তার মতো অসংখ্য রান্ডেলের দেখা পাওয়া যায়। আর সব রাষ্ট্রই সমাজের এই রান্ডেলদের পাগল বলে নিক্ষেপ করে পাগলাগারদ কিংবা কারাগারে। পাঠক হয়তো ভাবিত হবেন, নুরা অথবা মফিজ পাগলাসহ বিস্তর পাগলের আনাগোনা যেখানে, সেখানে রান্ডেল নামের এক ভিনদেশি পাগল নিয়ে কেন এত কথা?
কারণ তো অবশ্যই আছে। কারণটা হচ্ছে_রান্ডেল বিশ্ব সিনেমার অনত্যম উদাহরণ 'ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কু'স নেস্ট'-এর অন্যতম চরিত্র। এই সিনেমা সেই পরিচিত আখ্যানটি বয়ান করে, যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সত্যিকার স্বাধীন সত্তার মানুষকে পরিকল্পিতভাবে বন্দি করা হয় সামাজিক-নৈতিক বিধি-নিষেধের কারাগারে বা পাগলাগারদে।
চেক রিপাবলিকান নির্মাতা মিলোস ফোরম্যান ১৯৭৫ সালে ক্যান কেসির উপন্যাস অবলম্বনে বড় পর্দায় গল্পটির একটি আধ্যাত্মিক বৃত্তান্ত হাজির করেন। শক্তিমান মার্কিন অভিনেতা জ্যাক নিকলসন রান্ডেল চরিত্রটির সার্থক রূপায়ণ করেন। কথিত আছে, এই চরিত্রটির মাধ্যমে হলিউডের মেধাবী অভিনেতা জ্যাক নিকলসনের শৈল্পিক উত্তরণ ঘটেছে, রান্ডেল স্যাকমারফি তথাকথিত সাইকিক রোগী হলেও তার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনোলোক বা অন্তর্লোকের ধামাচাপা পড়া দিকটি উপলব্ধি করার সুযোগ পাই। আপাত আবেগতাড়িত অথচ দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী চরিত্রটি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তত্ত্ব পেরিয়ে হৃদয়পুরে গুমরে মরা সত্তাটিকে নিজের পথটুকু খুঁজে নিতে উস্কে দেয়।
অবধারিত পরিণতি নিয়মিত ক্ষমতাশালীর সঙ্গে অনিবার্য সংঘাত।
সিনেমায় আরো আছে লুইস ক্লেবার রূপায়িত সেবিকার শুভ্র পোশাকে পাগলা গারদের শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী ফ্যাসিস্ট চরিত্রের র্যাচেল ।
চিত্রনির্মাতা র্যাচেলকে উপস্থিত করেছেন তথাকথিত সুস্থ-অর্থ-যুক্তিসর্বস্ব মানুষের প্রতিনিধি রূপে। এই চরিত্রটির মূল সুর বিরক্তির উদ্রেক করলেও লুইস ক্লেবার তা পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সে গারদের (মূলত স্বাধীনচেতা) মানুষদের আনন্দ ও স্বাতন্ত্র শুষে নেওয়ায় রত। কিন্তু তার পরও দর্শক হিসেবে কেউ তাকে একেবারে ঘেন্না করতে পারবেন না। কেননা প্রতিষ্ঠানের বাইরে তার দেখা মেলে অন্য এক চেহারায়। যেখানে তারও কিছু মর্মান্তিক কর্মের নমুনা দেখা যায়, যা সে যত্ন করে ঢেকে রাখে, পাছে লোকে তাকেও পাগল না বলে বসে!
দৃশ্যান্তরে অবধারিতভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে রান্ডেল বনাম র্যাচেল তথা স্বাধীন সত্তা বনাম প্রতিষ্ঠানিকতার দ্বন্দ্ব এবং অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের জয়। শাস্তিস্বরূপ গারদ বাসিন্দাদের ভাগ্যে কখনো জোটে ইলেকট্রিক শক্। কখনো বা তাদের একলা ঘরে আটকে রাখা হয়।
এবার নিশ্চয় ভাবছেন, এত সহজ-সরল ও সাদামাটা ছবি। কিন্তু না! চেক নির্মাতা মিলোস ফোরম্যানের মুনশিয়ানা তিনি সোজা পথে হাঁটেননি।
'ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কু'স নেস্ট'-এ চেতনা প্রত্যাশিত ঘটনাগুলোকে অতিক্রম করা হয়েছে গারদের অন্য রোগীদের কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক সাব-প্লটের মাধ্যমে। একই সময়ে তাই দেখা যায় ভিন্ন ভিন্ন অভিঘাত ব্যঞ্জক ঘটনা। যে কারণে দর্শকের দৃষ্টি শুধু রান্ডেল ও র্যাচেলের ওপর নিবদ্ধ থাকে না, তাকে একই সঙ্গে বিশাল দেহী রেড ইন্ডিয়ান চিফ, যৌনকামনায় বিভোর তোতলা কিশোরসহ অনেকের অনুভূতিতে প্রতিনিয়ত জারিত হতে হয়। যুগপৎভাবে চিফ বা র্যান্ডেলের জন্য হৃদয় যেমন তরল হয় অথবা তোতলা কিশোরটির জন্য হৃদয়ে যে পরিমাণ বাষ্প-চাপের সৃষ্টি হয় ঠিক সমপরিমাণ ঘৃণা-বাষ্পের উদগিরণ ঘটে র্যাচেলের জন্য।
সুগঠিত চিত্রনাট্য ও দুর্দান্ত পরিচালনার গুণে সিনেমাটি এভাবেই দর্শকের মননের শেষসীমা পর্যন্ত সন্তর্পণে প্রতি মুহূর্তে অনুরাগ-বিরাগের উম্মেষ ঘটিয়ে চলে। তৈরি করে এক আচ্ছন্নতা। বিস্তার ঘটে অজস্র প্রশ্নের_এটি কি শুধুই ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠানের গল্প? নাকি ব্যক্তিগত মানবতার একঘেয়ে বক্তৃতার অপনয়ন? বা সামাজিক শৃঙ্খলার নেতিবাচক দিকের একটি আলেখ্য? দর্শক ঘোরে পতিত হয়।
তবে একেবারে সাধারণ অর্থে, এটি একটি সফল সিনেমা, যেখানে সাবলীলভাবে আখ্যানটি চিত্রিত হয়েছে। অনেক চিন্তার খোরাক জোগানো এই ছবিটি রেগুলার হলিউডি সিনেমার রীতিতে চিড় ধরাতে পেরেছিল। এটি ১৯৭৫ সালে সেরা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেত্রী ও সেরা চিত্রনাট্যসহ মোট পাঁচটি বিভাগে অস্কার জেতে।
আমাদের চারপাশের স্বাধীন সত্তার মানুষগুলোকে চিনে নিতে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে 'ওয়ান ফ্লিউ ওভার দ্য কাক্কু'স নেস্ট' হতে পারে সবসময়ের জন্য উপযোগী এক মোক্ষম হাতিয়ার।
মন্তব্য
আনেক ভাল্লাগা সিনামা! সুযোগ করে সব্বার দেখা উচিৎ।
'আপোক্যলাপস নাউ' এর উপর আপানার রিভিউ পড়তে চাই।
ধন্যবাদ ভ্রাতা। আশাকরি আপনার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব।
ইমরান ফিরদাউস
আগ্রহ জাগানিয়া, সিনামাডা দেকতাম চাই।
তাইলে আবার দেখা হোক ।
ইমরান ফিরদাউস
শেষাবধি পড়েও কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না নূরা অথবা মফিজকে নিয়ে কেন আলোচনা করলেন না? বাঙালি হওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো অপরাধ আছে বলে তো আপনি প্রমাণ করতে পারলেন না। নূরা এবং মফিজ-এর জীবনযাপন, কীর্তিকলাপ, দোষগুণ ইত্যাদি বিশ্লেষণ না করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে তাদেরকে ছোট করার কারণ কী? বক্তব্য দীর্ঘায়িত করে আপনাদের বিরক্তি উদ্রেক করবো না, সংক্ষেপে বলেই শেষ করবো ইত্যাদি বাক্যালাপ যেমন প্রকারান্তরে সহানুভূতির বদলে বিরক্তি সৃষ্টি করে, তেমনি ওটা না নিয়ে এটা নিয়ে কেন লিখছি, ইত্যাদিও আমার কাছে অহেতুক বলে মনে হয়। আপনি অনেক ভাল লেখেন, আমি আপনার লেখা পছন্দ করি। এইসব তুচ্ছ বিষয়গুলো পরিহার করলে আরো অনেক মানুষ আপনার লেখা পছন্দ করবে বলে আমার ধারণা।
লেখা বরাবরের মতো ভাল হয়েছে। তবে সিনেমার গল্পের সাথে সাথে নির্মাণের অন্যান্য বিষয়গুলো আনলে আরো ভাল লাগতো। বিশেষ করে চিত্রনাট্যে যেহেতু অস্কার পেয়েছে, সুতরাং কাহিনী বিন্যাসের আরো কিছু খুঁটিনাটি আসতে পারতো। সিনেমাটোগ্রাফিতে অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিল ছবিটি, সেই ব্যাপারও আসতে পারতো। সংলাপের ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার একটু শুচিবায়ু আছে, তবে এমন অনেককে চিনি, যারা সংলাপকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়, সেসব নিয়েও আলোচনা হতে পারতো।
রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু, কেউ নেই শূন্যতা-
আকাশে তখন থমকে আছে মেঘ,
বেদনাবিধুর গীটারের অলসতা-
কিঞ্চিৎ সুখী পাখিদের সংবেদ!
ধন্যবাদ আপনার মূল্যবান মতামতের জন্য এবং আমার লাখা আপনার ভাল লাগে তা জেনে ভাল লাগলো।
ইমরান ফিরদাউস
মন্তব্য