slideshow 1 slideshow 2 slideshow 3

You are here

শাশ্বত-এর ব্লগ

নিলুর নীল পাগড়ী (সমাপ্ত)

(৬)
কয়েক বছর পরের শেষ বৈশাখের এক দুপুর বেলা। খালে জোয়ারের স্রোত প্রবল বেগে ঢুকছে। স্রোতের শক্তি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন। নীলুদের নৌকা ঘাটে বাঁধা, স্রোতে একটু একটু কাঁপছে। নীলু নৌকায় উঠে গামছা পেতে শুয়ে পড়ল। গাছের পাতায় পাতায় চড়া রোদের দখলদারী, বাতাসে রোদ কাঁপছে না পাতা কাঁপছে বোঝা শক্ত। পুরো তল্লাটে মানুষের কোন নাম গন্ধ নেই। একটা ঘুঘু থেমে থেমে ডেকে চলছে, ঘুঘুর ডাকে বুকের ভেতর কেমন যেন হাহাকার লেগে যায়। নীলু বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে উঠে বসতে চেষ্টা করল, কিন্তু সে উঠতে পারল না, পিঠে মনে হল ভারী পাথর বাঁধা আছে, মেরুদণ্ড যেন অসাড়, সে বুঝতে পারছে একটা অদ্ভুত কিছু তার রক্তে ছুটে বেড়াচ্ছে, সবকিছু কেমন বিকল করে দিচ্ছে। 

নিলুর নীল পাগড়ী (দ্বিতীয় অংশ)

(৪)
গ্রীষ্মের ছুটিতে আনোয়ারার কন্যা নাজমা আক্তার, জামাই বজলুল হুদা এবং একমাত্র নাতনি রানু পরদিন সকালে এসে উপস্থিত। এই দিনই আসবে এমন কোন কথা ছিল না, তবে জামাই চিঠি পাঠিয়েছিল এরকম কোন এক সময়েই আসবে। রানুর স্কুল ছুটি হয়েছে, জামাইয়ের কলেজও ছুটি, সে আবার দূরের এক উপজেলা সদরে কলেজের সহকারী অধ্যাপক। রানুরা প্রতিবছর অন্তত দুইবার এ বাড়িতে আসে, শীতে একবার, গ্রীষ্মে একবার। এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ থেকে তারপর ফিরে যায়।
 
জন্মের পর চার বছরের মত এই গ্রামেই কাটে রানুর, তাই সারা বছর সে বাড়ি আসার জন্য মুখিয়ে থাকে। স্কুল ছুটি হবার সাথে সাথে সে মা-বাবার কান ঝালাপালা করতে থাকে, কবে বাড়ি যাব, বাবা ছুটি নেয় না কেন, ইত্যাদি। 

নিলুর নীল পাগড়ী

(১)
আনোয়ারা চিকন ক্ষীণ সুরে অজিফা পড়ছিলেন পূব দিকের জানালার পাশে বসে। ঘরের বাইরের এই দিকটায় বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। বেগুন, ডাঁটাশাক, ঝিঙে এ ধরনের কিছু সবজির অনিয়মিত চাষ হয়। একপাশে বাতাবী, অন্যপাশে পেয়ারা গাছ প্রায় একা একা। খোলা জায়গাটা পার হয়ে আরো পূবে গেলে ঘন গাছের বাগান - নারিকেল, সুপারি, রেনট্রি, মেহগনি, ছাতিম, বকুল, গাব ইত্যাদি। বিকেল নামলে গাছের সবুজ সারিতে আলো পড়ে পুরো চত্বরে একটা হলদে-লাল আভা তৈরি হয়, জানালাটা আলোতে ভরে ওঠে। এই আলোয় বই পড়া আনোয়ারার বিশেষ প্রিয়। ছোটবেলার কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে, তখন এই আলো যেন আরো লালচে আর ঝকঝকে ছিল। দুপুর গড়িয়ে গেলে যখন সবাই ঝিমাতে শুরু করত, আনোয়ারা বাবার বইয়ের স্তূপ থেকে রূপকথার কোন বই নিয়ে এই জানালার পাশে এসে বসত, কখনো পড়ত আবার কখনো ঠায় চেয়ে দেখত সবুজ-লালচে আলোর সাগরে একটা লাল ফড়িং বেগুন ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে, কিংবা হলুদ প্রজাপতি হলুদ ঝিঙেফুলে বসে নিজেই যেন একটা পাপড়ী হয়ে গেছে, আবার পাখা নেড়ে হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে। 

অস্তমান

এখন এই মধ্যকার্তিকে-
আরক্ত সূর্য নামছে হলুদ ধানক্ষেতের ওইপারে।
 
দিগন্তের অন্ধকারে রক্তপিপাসু তান্ত্রিকের, সবটুকু হেমরস
শুষে নেয়া নিমিলিত চোখ, উন্মগ্ন এখন।
ফিনফিনে কুয়াশায় ছোপছোপ মাঠ- আধকাটা ফসল 
যেন হাই তুলছে দৈনন্দিন ঘুমের আগে মুড়ি দেয়া 
কাঁথার ভেতর আলস্যে ও পরম শান্তিতে।
দড়ির মত দিগন্তে ছুটে যাওয়া মেঠোপথ,
পাশেই সেই পুরাকালের নদী পেটফোলা সাপের মত, 
আকাশে রক্তিম মেঘ, তার জলছবি
বুকে নিয়ে আন্দোলনহীন, স্থির-

মর্ষকামী

তোমার যদি কহতব্য কিছু থাকে - 

বল না, করোটিতে ঝনঝনিয়ে

মগজেই মরে যাক।

 

দেয়ালেরও কান আছে -

শত্রুবৎ পৌঁছে দেবে

চাপাতির কানে।

 

জলাশয়

বিশাল বটের শেকড়ের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে বুড়োটা অথৈ জলের দিকে মুখ করে আছে। উস্কখুস্ক চুল, চোয়ালের পেশি মাঝেমাঝে চমকে চমকে উঠছে,  চোখ বন্ধ কিন্তু পিটপিট করছে। স্বপ্ন দেখছে না তো বুড়োটা? ঘুমন্ত শরীর যেমন নিশ্চিন্ত শিথিলভাবে পড়ে থাকে ঠিক তেমন নয়, কোথায় যেন ঘাটতি আছে, তটস্থ একটা ভাব আছে। মুখ, হাত, পায়ের অনেক পেশিই বুঝি সজাগ। আমি ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে যাই। মনে হল, ওইসব সজাগ কোষ আমার উপস্থিতি টের পাচ্ছে এবং প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। এইসব সজাগ পেশি হয়ত বুড়োকে চোখ খুলতে বাধ্য করবে এবং জিজ্ঞেস করতে বলবে, ‘আপনে ক্যাডা?’
 
এখানে আমি অনেককাল পর এলাম। নগরের কাছেই সূতার মত একটি নদী, বর্ষা এলে চারপাশের বিস্তির্ণ নিম্নভূমি ডুবে বিশাল এক জলাভূমির সৃষ্টি হয়। হাঁসফাঁস নগরের পাশেই এমন খোলা জলাধার, কিছুক্ষণ বসলে প্রাণ জুড়াবেই। দেখছি, এখন আর কেউ আসে না, একসময় মানুষের ভীড় লেগে থাকত। যেদিকে তাকাই আমি আর এই বুড়ো ছাড়া কেউ নেই, শুধু মহাসড়ক ধরে সাঁ সাঁ করে বাস-ট্রাক-গাড়ি চলে যাচ্ছে, এক পল থেমে জিরানোর মত কারও অবসর নেই।

টুকরো-টাকরা রবীন্দ্রনাথ

প্রার্থনা ও প্রেম

এবার রবীন্দ্র প্রয়াণে ঢাকার আকাশ মোটেই কাঁদল না। পুরো আকাশ জুড়ে মনে হল শরতের মেঘকে ধাওয়া করে নিয়ে যাচ্ছে বাতাস। যদিও শরত দরজায় খাড়া, তবু এই খেলা শুরু হয়েছে বর্ষাকালের শুরু থেকেই, আষাঢ় মাস আরম্ভ হতেই। মাঝে মাঝে বর্ষা তার চেহারা দেখালেও এই ছিল এবার বর্ষাকালের সাধারণ রূপ। হয়ত ভাল একটা ঝুম ঝুম বর্ষাকাল পাবার জন্য আগামী বছর কিংবা আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।